ভয়ংকর সুন্দর ভিতরকণিকা

চাঁদবালী থেকে আমদের নৌকা ছেড়েছে প্রায় ৪০ মিনিট হল।  গ্রাম বাংলার ছেলে হয়ে আশেপাশের পরিবেশ যে একেবারেই অচেনা তা বলতে পারি না , পার্থক্য অবশ্যই আছে।  আর সেইটুকু যদি না থাকে তহলে উপভোগই বা করি কি করে।  সকালের ব্যস্ততার ছোঁয়া চারিদিকে।  সড়ক পথে যোগাযোগের সুবিধা থাকলেও দেখলাম নদী পথে পরিবহন হচ্ছে ব্যপক ভাবে।  জেলেরা মাছ ধরছে নদীতে।  নদীর নাম ? … বৈতরণী।  ওড়িশা রাজ্যের প্রায় ৬৫% কৃষি জমিতে ধান চাষ হয়।  বৈতরণীর দুই পাশে যেন তারই প্রতিচ্ছবি – বিস্তীর্ণ জমিতে ধান কাটা হয়ে গিয়েছে।  এখন তা গবাদি পশুর চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে।  নৌকা থেকে যে জিনিসটা বেশী করে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে তা হল নদীর দুই পাশে ধানের গোলা , বহু পরিশ্রমের প্রতীকস্বরূপ যা মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে আছে।  ধীরে ধীরে আমাদের ডান দিকে এগিয়ে এল ম্যানগ্রোভ অরণ্যের এক বিচ্ছিন্ন অংশ , সেখানে আমরা কয়েকটা বক দেখতে পেলাম।  আমার অদক্ষ চোখ নিজের অজান্তেই গভীর বনের ভিতর চলে যাচ্ছিল বারবার , জনি না কিসের আশায়।  এক সহযাত্রী হটাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন ‘কুমির -অ’ বলে।  তার হাত অনুসরণ করে দেখতে পেলাম জলের রাজা ভেসে চলেছেন আমাদের নৌকা এবং ম্যানগ্রোভ অরণ্যতটের মাঝ বরাবর।  ২০ – ২৫ সেকেন্ডের এই দৃশ্য যেন আমাদের পুরো অভিযানের সাফল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল।  আমি মাঝিকে জিজ্ঞাসা করলাম ‘এরা  মানুষকে আক্রমণ করে ?’ সে উত্তর দিল ‘হ্যাঁ’।

কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই ভিতরকণিকার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছিলাম।  একেতো হাতে সময় কম , তার উপর আবার ভিতরকণিকা সম্বন্ধে যথেষ্ট তথ্যের অভাব।  সুতরাং আমার মূল্যবান সময় এবং ততোধিক মূল্যবান সঞ্চয়ের সদ্ব্যবহার কতটা করে উঠতে পারব সে ব্যাপারে যথেষ্ট সংশয়ের মধ্যে ছিলাম।  ১৩ ই ফেব্রুয়ারী দুপুর বেলায় হাওড়া থেকে যাত্রা শুরু করলাম এবং চাঁদবালীতে এসে পৌঁছালাম প্রায় রাতে।  পৌঁছানোর সাথে সাথেই আমাকে জানিয়ে দেওয়া হল এবছর ভিতরকণিকা ভ্রমণের নির্দিষ্ট সময়কাল প্রায় শেষের মুখে , সুতরাং এই অবস্থায় আমার একলার জন্য কোন ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়।  যাই হোক পরের দিন সকালে ভিড়ে গেলাম শিক্ষকদের একটা দলের সাথে।  আমার ভাগ্যটাও ভাল ছিল , কারণ দিনটা ছিল রবিবার।

পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের পরেই ভারতবর্ষের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য হচ্ছে ওড়িশার ভিতরকণিকা যা নোনা জলের কুমিরের জন্য বিখ্যাত।  কুমির প্রজাতির মধ্যে আকারে সর্ব বৃহৎ হল নোনা জলের কুমির।  এমনকি সরীসৃপকুলের মধ্যে ওজনের দিক থেকে এদের বৃহত্তম মানা হয়।  কম কথায় এই হচ্ছে ভিতরকণিকা।  যে দুটো নদীর নাম না করলেই নয় তা হল ব্রাহ্মণী ও বৈতরণী।  এদের সঙ্গমস্থলে প্রায় ৬৫০ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে ভিতরকণিকা অভয়ারণ্য।

ভিতরকণিকায় একটা thrilling ব্যাপার আছে।  এখানে নদী শাখার প্রতিটি বাঁক যেন লাজুক অরণ্যের অপার রহস্য উন্মোচনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে আপনারই জন্য।  নিরবিচ্ছিন্ন সজাগ দৃষ্টির অভাব হলে ভিতরকণিকা ভ্রমণের রস আস্বাদন করা সম্ভব নয়।  ক্ষণিকের অন্যমনস্কতা আপনাকে যে কোন সুন্দর মুহূর্ত থেকে বঞ্চিত করতে পারে।  আমার ক্ষেত্রেও ঘটেছে।  টাটকা crocodile tracks দেখে হা হুতাশ করতে হয়েছে – ইস্ ! দেখতে পেলাম না।

ডাংমলে মধ্যাহ্নভোজের আগে আমরা আশেপাশের জায়গাগুলো ঘুরে নেব বলে ঠিক করলাম।  সেইমতন চললাম অরণ্যের ভিতর প্রাচীন শিব মন্দিরের উদ্দেশ্যে।  প্রায় ৩ কিমি পথ হেঁটে চললাম এবং সত্যি কথা বলতে কি একটুও একঘেঁয়ে লাগে নি।  ম্যানগ্রোভ রাজত্বে একটু অন্যরকম স্বাদ পেলাম এখানে।  শিব মন্দিরের পাশেই পুরানো একটা স্থাপত্য।  কেল্লার ক্ষুদে সংস্করণ আর কি , সম্ভবত পশু শিকারের জন্য বানানো হয়েছিল।  এখানে পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য একটা ওয়াচ টাওয়ার আছে।  তবে খুবই কম সংখ্যক পাখি দেখতে পেলাম সেখানে।  অন্য একটি ওয়াচ টাওয়ারে যাওয়া হল।  সেখানেও একই অবস্থা।  জানা গেল অক্টোবরের সময়ে পাখিদের আধিক্য হয় এই সব অঞ্চলে।  পাওনা বলতে ভিন্ন স্বভাবের লাল কাঁকড়া , মাডস্কিপার এবং রঙ্গিন মাছ।

সম্পূর্ণ ভ্রমণযাত্রায় কুমির ছাড়াও দেখতে পেয়েছিলাম কয়েকটি ঘড়িয়াল জাতীয় প্রাণী , যদিও আমার পর্যবেক্ষণ ভুল হতে পারে , এছাড়া ছিল গোসাপ , প্রায় সর্বত্র এরা ঘুরে বেড়াচ্ছে।  তবে সব থেকে বড় চমক অপেক্ষা করছিল ডাংমল যাওয়ার পথে।  প্রায় ১৪ – ১৫ ফুটের একটি কুমির চলে এসেছিল একদম আমাদের নৌকার সামনে।  চোয়াল দুটো খোলা অবস্থায়।  এরকম দৃশ্য দেখে একটা কথাই মনে পড়ে ‘ভয়ংকর সুন্দর’।  এছাড়া আমাদের নজর বন্দী হল কিছু হরিণ।

ডাংমলে কুমির সংরক্ষণ প্রকল্পের কার্যকলাপ সম্বন্ধে পরিচিত হওয়ার যথেষ্ট অবকাশ পেলাম।  সুন্দর পরিবেশ।  চমৎকার বাংলো।  বাংলোর সামনেই আছে ডিয়ার পয়েন্ট।  আশ্চর্য ব্যাপার সেখানেও ধরা দিল সোনার  হরিণ।

ওয়াচ টাওয়ারে পাখি না দেখতে পাওয়ার সাধ মিটল ফেরার পথে।  পড়ন্ত বিকেল।  জোয়ারের জল বাড়ছে হু হু করে।  দুপাশে গাছের ডালে চেনা এবং অচেনা সব পাখি , যেন আমাদের জন্যই বসে আছে।  সঙ্গম স্থলে যখন এসে পৌঁছালাম হাওয়ার দাপটে নৌকার তখন টালমাটাল অবস্থা।  সমস্ত বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে চাঁদবালীতে ফিরে আসলাম সন্ধ্যার আগেই।

পরের দিন বড়ি ফেরার জন্য রওনা হলাম।  কিছু দিন পরেই ভিতরকণিকার খবর বেরোল – কুমিরের আক্রমণে মৃত্যু হয়েছে এক মহিলার।  মনটা খারাপ হয়ে গেল।  সেই মাঝির কথা মনে পড়ে গেল।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s